কুমিল্লার হোমনা উপজেলার অন্যতম প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোমনা সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৯৮ বছরে পদার্পণ করেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের ধারক-বাহক হিসেবে কালের সাক্ষি হিসাবে বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
দেশ স্বাধীনের আগে হোমনা অঞ্চলটি দাউদকান্দি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন থেকেই এ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক অনন্য পরিবেশ বিরাজমান ছিল। এ জনপদে কৃষক,জেলে কামার, কুমার ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী ও সাধারণ মানুষ মিলেমিশে বসবাস করতেন। সেই সময় থেকে রোববার হোমনা বাজারে সাপ্তাহিক হাট ও সকালের আড়ং বসতো, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত১৯৪০ সালে সুন্দর আলী ভূঁইয়া ও তমিজ উদ্দিন নামের দুই মহান ব্যক্তি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করার ফলে শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। যা পরবর্তীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রুপনেয়। বর্তমানে স্থানটি ছিল বর্তমান ইউআরসি ইন্সটিটিউট। তার ধারাবাহিকতায় পর্যায় ক্রমে হোমনা-১ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত।
সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ১৯০৫ সালে হোমনায় একটি ফাঁড়ি থানা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে পূর্ণাঙ্গ থানা প্রতিষ্ঠা পায়।
সেই সময় থেকে এ অঞ্চলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এলাকার মানুষ ও সূশীল ব্যক্তিরা। যদিও ১৯১৯ সালে নিকটবর্তী মাথাভাঙ্গায় ভৈরব বাবুর নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্ত, হোমনা অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য তা ছিল দূরবর্তী ও কষ্টসাধ্য।
বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। দূরপাল্লার পথ, বর্ষাকালে যাতায়াতের অসুবিধা—সব মিলিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে এবং হিন্দু জমিদার স্বর্গীয় পূর্ণচন্দ্র রায়ের স্ত্রী অন্যদা সুন্দরীর জমিদানের মাধ্যমে ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হোমনা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যা পর্যায় ক্রমে হোমনা সসরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে হোমনা সদরের ভারত চন্দ্র পোদ্দারসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করেন মো. রমিজ উদ্দিন নামের মহান শিক্ষক। সেই সময় এলাকার শিক্ষিত যুবকেরা স্বেচ্ছাশ্রমে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তীতে কুমুদ চন্দ্র চক্রবর্তী, আবদুল গফুর, লাল মিয়া ও ভারত চন্দ্র পোদ্দারসহ অবৈতনিক শিক্ষকরা নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করে বিদ্যালয়টির ভিত্তি মজবুত করেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি প্রথমে জুনিয়র স্কুল হিসেবে অনুমোদন লাভ করে এবং পরে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বীকৃতি পায়। বিদ্যালয়ের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সে সময় বিদ্যালয়ের পরিচালনায় বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আবদুল করিম ( করিম সাব), মো. রিয়াজুল হক ( হক সাব) লাল মিয়া কমান্ডার, আবুল কাশেম ভান্ডারীসহ অনেকেই।
এ দিকে হোমনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন সর্বজনাব শ্রী কুমুদ চন্দ্র চক্রবর্তী, মো. আবদুল হাকিম, মুল্লুক হোসেন, মো.নূরুল ইসলামবিকম ( ভারপ্রাপ্ত), মো. একে এম ফজলুল হক( ভারপ্রাপ্ত), মো. মনিরুল ইসলাম, মো. জসিম উদ্দিন( ভারপ্রাপ্ত), আবদুল মারুফ কাইয়ুম( ভারপ্রাপ্ত) ও মো. তাইজুল ইসলাম প্রমুখ।
উল্লেখ্য ১৯৭৭ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম এসএসসি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ায় বিদ্যালয়টি ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে এটি পাইলট প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন এটি “হোমনা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়” নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে জাতীয়করণের মাধ্যমে বিদ্যালয়টির নামকরণ হয় হোমনা সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্থানীয় জনগণের সার্বিক সহযোগিতা ও শিক্ষকদের নিষ্ঠার ফলে বিদ্যালয়টি আজ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ১৯২৯ সালে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৯৮ বছর অতিক্রম করে ৯৯ বছরে পদার্পণ করেছে। আমি উক্ত বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসাবে গর্ববোধ করছি।
সংকলন:
সাংবাদিক মো. আবদুল হক সরকার
সভাপতি,
হোমনা প্রেস ক্লাব,হোমনা কুমিল্লা
দৈনিক দর্পণ নিউজ দৈনিক দর্পণ নিউজ 24